যিয়ারতে মদীনা: ফজিলত ও তাৎপর্য

52

মদীনার নামসমগ্র

১- আলা মাদীনা:

আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

(يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعۡنَآ إِلَى ٱلۡمَدِينَةِ لَيُخۡرِجَنَّ ٱلۡأَعَزُّ مِنۡهَا ٱلۡأَذَلَّۚ )

{তারা বলে, যদি আমরা মদীনায় ফিরে যাই তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে প্রবল, দুর্বলকে বহিষ্কার করবে।}
[সূরা আল মুনাফিকুন:৮]

২- তাবা:

জাবের ইবনে সামুরা রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, «নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মদীনার নাম তাবা রেখেছেন।»(বর্ণনায় মুসলিম)

৩- তাইয়েবা:

যায়েদ ইবনে ছাবেত রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, «নিশ্চয় মদীনা «তাইয়েবা», গোনাহকে সরিয়ে দেয় যেভাবে আগুন রুপার আবর্জনা সরিয়ে দেয়।»(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

মদীনার ফজিলত

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,«মদীনা তাদের জন্য উত্তম, তারা যদি জানত। যদি কেউ মদীনাকে নিরাগ্রহবশত ছেড়ে যায়, তবে আল্লাহ তার জায়গায় তার থেকেও উত্তম কাউকে বসবাস করাবেন। আর মদীনার কষ্ট-যাতনায় যে ধৈর্য ধরবে আমি অবশ্যই তার জন্য সুপারিশকারী হব অথবা কিয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষী হব।»
(বর্ণনায় মুসলিম)

২ - আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন। «আমাকে একটি জনপদে হিজরত করে যেতে বলা হয়েছে, যা সকল জনপদকে খেয়ে ফেলবে। মানুষ একে য়াছরিব বলে, আর তা হলো মদীনা। মদীনা খারাপ মানুষদেরকে সরিয়ে দেয় যেভাবে কামারের হাপর লোহার আবর্জনা সরিয়ে দেয়।»(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

মদীনার বৈশিষ্ট্য

১ - আইর ও ছাওর পাহাড়দ্বয়ের মধ্যবর্তী মদীনা নিরাপদ ও পবিত্র অঞ্চল। অতএব মদীনার গাছ কাটা ও শিকারজন্তু শিকার করা নিষিদ্ধ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, «আইর ও ছাওরের মধ্যবর্তী মদীনা পবিত্র অঞ্চল। অতঃপর যে ব্যক্তি এতে কোনো বিদআতের উদ্ভব ঘটাবে অথবা বিদআতীকে আশ্রয় দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমস্ত মানুষের লানত।»
(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

২ - মদীনায় নামাজের ছাওয়াব বর্ধিত আকারে অর্জিত হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, «আমার এ মসজিদে নামাজ আদায় অন্যকোনো মসজিদে এক হাজার নামাজের চেয়েও উত্তম, তবে মসজিদুল হারামের কথা ভিন্ন।»(বর্ণনায় বুখারী )

৩ - মদীনায় রাওযাতুন মিন রিয়াজুল জান্নাত রয়েছে, যাতে নামাজ আদায় করা সুন্নত।

আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,«আমার ঘর ও আমার মিম্বারের মধ্যবর্তী জায়গা জান্নাতের রওজাসমূহের একটি রওজা। আর আমার মিম্বার আমার হাউজের ওপর।’

৪- মদীনায় শেষ যুগে দাজ্জাল প্রবেশ করবে না। মহামারিও প্রবেশ করবে না।

আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন «মদীনায় দাজ্জাল আসবে, কিন্তু সে মদীনাকে ফেরেশতাদের দ্বারা প্রহরারত অবস্থায় দেখবে, অতঃপর মদীনায় মহামারি ও দাজ্জাল প্রবেশ করবে না ইনশাআল্লাহ।» (বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

৫- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার বরকতের জন্য দুআ করেছেন। আনাস রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন,«হে আল্লাহ, আপনি মদীনাকে মক্কার তুলনায় দ্বিগুণ বরকতপূর্ণ করুন।»(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

মসজিদে নববী যিয়ারতের হুকুম

মসজিদে নববী যিয়ারত করা হজ্বের রুকন, শর্ত অথবা ওয়াজিবের মধ্যে শামিল নয়। তা বরং সুন্নত এবং যেকোনো সময়ই করা যায়।

তবে যিয়ারতে মদীনার উদ্দেশ্য হতে হবে মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর যিয়ারত উদ্দেশ্য হলে শুদ্ধ হবে না। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,«তোমরা তিন মসজিদের উদ্দেশ্য ব্যতীত সফর করো না: মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদুল আকসা।

যদি সফরের উদ্দেশ্য মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় না হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর যিয়ারত হয় তবে অধিকাংশ আলেমদের মতে তা শরীয়তসিদ্ধ হবে না। শরীয়তে এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশও আসেনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনা গমন-বিষয়ক যেসব হাদীস উল্লেখ করা হয় তা আহলে ইলমের ঐক্যমত্য অনুযায়ী যঈফ অথবা মাওযু। নির্ভরযোগ্য হাদীসবিদগণের কেউই এসব হাদীস বর্ণনা করেননি। ইমামদের কেউ এসব হাদীস দলিল হিসেবেও উল্লেখ করেন নি»|

যিয়ারতের হুকুম ও আদব

১ - যখন যিয়ারতকারী মসজিদে নববীতে পৌঁছবে, ডান পা আগে দেবে ও বলবে اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ (হে আল্লাহ, আপনি আমার জন্য রহমতের সকল দরজা উন্মুক্ত করে দিন।)

২ - তাহিয়াতুল মসজিদের দু রাকাত নামাজ পড়বে। এ দু রাকাত রওজাতুল জান্নাতে পড়তে পারলে ভালো।

৩ - নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর, তার দুই সাথী আবু বকর ও উমর রাযি. এর কবর যিয়ারত করা সুন্নত। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের সামনে আদবের সাথে দাঁড়াবে। আওয়াজ নিচু রাখবে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করবে। এরপর আবু বকর রাযি. ও উমর রাযি. এর প্রতি সালাম পেশ করবে।

৪ - মসজিদে নববী যিয়ারতের সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে নববীতে আদায় করা, বেশি বেশি দুআ-যিকর করা, নফল নামাজ পড়া, বিশেষ করে রওজাতুল জান্নাতে, সুন্নত বলে বিবেচিত।

৫ - নামাজ আদায়ের উদ্দেশে মসজিদে কুবা যিয়ারত করা সুন্নত। যদি শনিবারে তা সম্ভব হয় তবে তা উত্তম। ইবনে উমর রাযি. বলেন: «নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরোহিত অবস্থায় ও পায়ে হেঁটে মসজিদে কুবায় যেতেন। তিনি তাতে দু রাকাত নামাজ আদায় করতেন।»(বর্ণনায় মুসলিম) অন্য শব্দমালায় এসেছে, «তিনি কুবায় যেতেন অর্থাৎ প্রতি শনিবার।»(বাকী: মসজিদে নববী সংলগ্ন কবরস্থান যেখানে অনেক সাহাবী কবরস্থ রয়েছেন। )

৬ - বাকীর কবরস্থান যিয়ারত করাও সুন্নত। হামযা রাযি.সহ উহুদযুদ্ধের শহীদদের কবর যিয়ারত করাও সুন্নত; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কবর যিয়ারত করতেন এবং তাদের জন্য দুআ করতেন। তিনি বলতেন:

«السلام عليكم أهل الديار من المؤمنين والمسلمين، وإنا إن شاء الله بكم لَلَاحقون، أسأل الله لنا ولكم العافية»

(আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক হে অত্র জায়গায় বসবাসকারী মুমিন-মুসলিমগণ। আমরা (আপনাদের সাথে) যুক্ত হব, ইনশাআল্লাহ। আমাদের জন্য ও আপনাদের জন্য আল্লাহর দরবারে পরিত্রাণ কামনা করি।)

যিয়ারতের ভুলত্রুটি

১ - কবর যিয়ারত ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ দেখার জন্য মদীনায় সফর করা। বরং শরীয়তসিদ্ধ হলো মসজিদে নববী যিয়ারত ও তাতে নামাজ আদায় করার উদ্দেশ্যে সফর করা। আর মসজিদে নববীতে গমন করলে কবর যিয়ারত স্বতঃস্ফূর্তভাবেই হয়ে যায়।

২ - দুআ করার সময় কবরমুখি হয়ে দুআ করা।

৩ - রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে কোনো কিছু চাওয়া। আল্লাহ ব্যতীত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে কোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রার্থনা করা। এরূপ করা নিঃসন্দেহে বড় শিরক।

৪ - কবরের কাছে আওয়াজ উঁচু করা। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা। যতবার মসজিদে প্রবেশ করবে ততবার দূর থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি সালাম দেয়া। সালাম পেশ করার পর নামাজে দাঁড়ানোর ন্যায় ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখা কিছুতেই উচিত নয়।

মদীনা মুনাওয়ারার ফজিলত

আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,«নিশ্চয় ইবরাহীম মক্কাকে পবিত্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন এবং মক্কার জন্য দুআ করেছেন। আমি মদীনাকে পবিত্র ঘোষণা করছি যেভাবে ইবরাহীম মক্কাকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। এবং আমি মদীনার জন্য দুআ করেছি। মদীনার মুদ ও সা (তৎকালীন দুটি শস্য মাপার পাত্র) এর জন্য দুআ করেছি, যেভাবে ইবরাহীম মক্কার জন্য করেছেন।»(বর্ণনায় মুসলিম)বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম



Tags: